রাজপথের সংগ্রাম থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা: বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক মহাকাব্য
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ও দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব বেগম খালেদা জিয়া। বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলন এবং দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রযাত্রায় তাঁর অবদান অপরিসীম। ১৯৮১ সালে স্বামী ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর জাতীয় ও দলীয় সংকটকালে রাজনীতির ময়দানে পা রেখেছিলেন তিনি। গৃহবধূ থেকে রাজপথের আপসহীন নেত্রী এবং পরবর্তীতে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবির্ভূত হয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন এক অনন্য ইতিহাস।সংকটকালে রাজনীতিতে আগমন ও বিএনপির কান্ডারি১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দেশ পরিচালনায় আসেন জিয়াউর রহমান, যিনি ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে জিয়াউর রহমান শহীদ হলে দেশ এক গভীর নেতৃত্ব সংকটে পড়ে।তৎকালীন নেতৃত্বের অনুরোধে দল ও দেশের অস্তিত্ব রক্ষায় ১৯৮২ সালে সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে যোগ দেন বেগম খালেদা জিয়া। এরপর ১৯৮৩ সালে দলটির ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে সর্বসম্মতিক্রমে চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।[১৯৮১] প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদত
│
▼
[১৯৮২] বিএনপিতে খালেদা জিয়ার যোগদান
│
▼
[১৯৮৪] বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত
│
▼
[১৯৯০] স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে জয়
│
▼
[১৯৯১] বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও 'আপসহীন' নেত্রীর খ্যাতি১৯৮২ সালে এরশাদ সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতা দখল করলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সর্বাত্মক আন্দোলনে নামেন বেগম জিয়া।রাজপথের সক্রিয় নেতৃত্ব: ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন এবং বারবার গৃহবন্দী ও কারারুদ্ধ হন।১৯৮৬ সালের নির্বাচন বর্জন: এরশাদ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রহসনের নির্বাচন বর্জন করে বেগম জিয়ার নেতৃত্বাধীন সাত-দলীয় জোট গণতান্ত্রিক নীতিতে অটল থাকেন।১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান: দীর্ঘ নয় বছরের লাগাতার আন্দোলনের পর ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। এই দীর্ঘ সংগ্রামে কোনো প্রলোভন বা দমন-পীড়নের কাছে মাথা নত না করায় তিনি পান ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধি।রাষ্ট্র পরিচালনা ও সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর গঠিত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হয় বিএনপি।প্রশাসনিক ও সামাজিক মাইলফলক বিস্তারিত বিবরণ প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ। সংসদীয় ব্যবস্থা পুনর্প্রবর্তন রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন। শিক্ষায় যুগান্তকারী পদক্ষে পসর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতার পাশাপাশি নারী শিক্ষার প্রসারে বিনামূল্যে শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালু। অর্থনৈতিক সংস্কার মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবর্তন ও উন্মুক্ত অর্থনৈতিক নীতির সূচনা। পরবর্তীতে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি পুনরায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এবং অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে নেতৃত্ব দেন।১/১১-এর চক্রান্ত, রাজপথের নিপীড়ন ও অটল অবস্থান২০০৬ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর সেনা-সমর্থিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার (১/১১) গঠিত হলে বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানো হয়। তাঁকে দেশত্যাগে বাধ্য করার নানামুখী চাপ দেওয়া হলেও তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দেন: "বাংলাদেশই আমার একমাত্র ঠিকানা, বিদেশে আমার কোনো দ্বিতীয় বাড়ি নেই।"পরবর্তী সাড়ে ১৫ বছরের শেখ হাসিনা সরকারের আমলেও চরম রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হন তিনি। সেনানিবাসের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে উচ্ছেদ, কারাবন্দিত্ব এবং চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত করার মতো রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন সহ্য করেও তিনি গণতান্ত্রিক চেতনা থেকে পিছপা হননি।গণঅভ্যুত্থান, চিরবিদায় ও নতুন দিগন্ত২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মুখে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটে। তবে দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতা ও নানা প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন এই মহীয়সী নেত্রী। তাঁর জানাজায় অংশ নেন দেশের লাখ লাখ মানুষ, যা মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম জনসমুদ্রে পরিণত হয়।বেগম খালেদা জিয়ার প্রস্থান ঘটলেও তাঁর রেখে যাওয়া দূরদর্শী রাজনীতির ধারায় পরিচালিত হচ্ছে আজকের বাংলাদেশ। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে বিএনপি। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি নিয়ে বর্তমানে দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে দেশ পরিচালনা করছেন তাঁরই সুযোগ্য সন্তান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।