ঢাকা    বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
রাজধানী টাইমস

লোভনীয় বেতনে চাকুরির কথা বলে রাশিয়ায় যুদ্ধে, ভিডিও কলে বাঁচার আকুতি

রাজবাড়ী গোয়ালন্দে দালালের খপ্পরে আলী হাসান সোহেল



রাজবাড়ী গোয়ালন্দে দালালের খপ্পরে আলী হাসান সোহেল

ভালো বেতনে কোম্পানির চাকুরির কথা বলে দালালের খপ্পরে পড়ে পাচার হয়ে রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে মানবতের জীবন যাপন করছেন আলী হাসান সোহেল (৪২) সহ কয়েক যুবক। প্রায় দেড় মাস পর পরিবারের সাথে যোগাযোগ হলে তাঁর কষ্টের কথা জানতে পারেন পরিবার। ড্রোনের আঘাতে আহত হয়ে একটি চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে বাঁচার আকুতি জানিয়েছেন তারা। 

আলী হাসান সোহেল রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার জুড়ান মোল্লার পাড়ার (কুমড়াকান্দি) আঃ হক এর ছেলে। পরিবারের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার বড় আলী হাসানকে দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানিয়েছেন পরিবার। সাথে দালালের উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা। আলী হাসান সোহেল ও সাথে থাকা আরও তিনটি পরিবার গত ১৯ মে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।  

অভিযোগ থেকে জানা যায়, আলী হাসান সোহেল সহ গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার উত্তর পাড়া ঘোসেরচর গ্রামের পলাশ শেখ, দারুলি কুরআন ফকিরবাড়ীর রনি ও বলাকইর এলাকার সৌরভ মোল্লা রাশিয়া যাওয়ার জন্য ঢাকার মালিবাগ এলাকার জাবেল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনার লিমিটেড (আরএল-২৫০৫) এজেন্সির মাধ্যমে গ্রুপের এই ৪ জনের কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা করে ২৮ লাখ টাকা, পাসপোর্টসহ যাবতীয় কাগজপত্র জমা নেয়। পরে মেডিকেলসহ কার্যক্রম সম্পন্ন করে রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে গত ৭ মে বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স নিয়ে রাশিয়া পাঠায়। রাশিয়ার একজন নারী প্রতিনিধি তাদরেকে বিমানবন্দর থেকে রাশিয়া নিয়ে যায়। 


রাশিয়া বিমাবন্দরে পৌঁছানোর পর রিক্রুটিং এজেন্সির পাঠানো ৩০ জনের দলকে হোটেলে রেখে তিনদিন পর সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। চুলকাটা, পোশাক পরিধানসহ সেনাবাহিনীর যাবতীয় কার্যক্রম করে। তাদের চারজনকেও সেনাবাহিনীর বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করে ভারি অস্ত্র (একে-৪৭) হস্তান্তর করেন। কয়েকদিন পর একটু সুযোগ পেয়ে পরিবারের কাছে মুঠোফোনে এসএমএস ও ভয়েসের মাধ্যমে জানায়, তাদের ৩০ জনের প্রত্যেককে রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে ৩০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করে বিক্রি করা হয়েছে। 

গোপালগঞ্জ পলাশ শেখের বাবা জামিল শেখ বলেন, বিষয়টি জানার পর জাবেল-ই-নূর এজেন্সির সাথে যোগাযোগ করে কেন প্রতারণা করা হয়েছে জানতে চাইলে কোন কর্ণপাত করেনি। আমাদের সন্তানদের রাশিয়ান সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণসহ পোশাক পরিহিত ছবি দেখালেও এজেন্সি কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করে এ বিষয়ে যোগাযোগ না করতে ভয়ভীতি দেখায়। এজেন্সির সাথে চুক্তিপত্র অনুযায়ী চারজনের কোম্পানির কাজের কথা বলে নেয়া হয়েছিল, সে কাজ দিতে না পারলে দেশে ফেরত পাঠানোর কথা। তাই আমাদের ২৮ লাখ টাকা, ক্ষতিপূরণসহ স্বশরীরে দেশে ফেরত পাঠাতে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আবেদন জানাচ্ছি। 

আলী হাসান সোহেলের বৃদ্ধ বাবা আঃ হক বলেন, আমার ছেলে এলাকায় অটোরিক্সা চালিয়ে এতবড় সংসার সামলাতো। প্রায় এক বছর আগে ভাতিজা আকাশ জানায়, তাঁদের নিকট আত্মীয় ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর এলাকার ইমরান হোসেন ভালো বেতনে রাশিয়ায় কোম্পানীর চাকুরি দিচ্ছে। ভাতিজার মাধ্যমে ইমরানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে ৮ লাখ টাকায় রাশিয়া পাঠানোর কথা বললেও সাত লাখ টাকায় পাঠাতে রাজি হয়। ৬০ হাজার টাকা দিয়ে চুক্তি করে চার মাসে চার লাখ টাকা পরিশোধ করেন। সর্বশেষ গত ১ মে বাকি তিন লাখ টাকা পরিশোধ করলে ৭ মে তাকে রাশিয়ায় পাঠায়। সমস্ত টাকাই ধারদেনা করে তাদেরকে দেওয়া হয়।  

আঃ হক বলেন, সোহেলের সাথে ভাতিজা আকাশসহ বোয়ালমারীর আরও কয়েকজনের যাওয়ার কথা ছিল। অথচ তারা কেউ না গিয়ে গত ৭ মে ৩০ জনের দলের সঙ্গে আমার ছেলেকে রাশিয়ায় পাঠায়। আমাদের শুধু জানানো হয় কোম্পানির চাকুরীতে যাচ্ছে। দুই বছরের কাজ শেষে আবার দেশে ফিরবে। এমনকি বিমানবন্দের আমাদের যেতে দেওয়া হয়নি। রাশিয়ায় যাওয়ার দেড় মাস পর একদিন ফোন করলে জানতে পারি, তাদেরকে যুদ্ধ করতে রাশিয়া থেকে ইউক্রেন পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে সেখানে একটি অস্থাীয় চিকিৎসা ক্যাম্পে আহত অবস্থায় পড়ে আছে। আমার ছেলেকে ফেরত চাই। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন, আমার সন্তানদের বাঁচান।

আলী হাসান সোহেলের স্ত্রী আকলিমা খাতুন বলেন, “আমার স্বামী রাশিয়া যাবার পর যোগাযোগ করতে পারিনি, খোঁজও নিতে পারিনি। কয়েকদিন পর একদিন ফোন করে জানায়, তাদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে ভাড়া করা সেনাবাহিনীর সাথে পাঠানো হচ্ছে। এরপর আর যোগাযোগ হয়নি। প্রায় দেড় মাস পর হঠাৎ একদিন ফোন করলে দেখি তার চেহারা আর আগের মতো নেই। চুল-দাঁড়ি বড়, হাত ব্যান্ডেজ করা, কানে তুলা পড়া। একটি তাবুর ভিতর থেকে কান্না করছেন আর বাঁচানোর আকুতি জানাচ্ছেন।” 

আকলিমা বলেন, আমরা সমস্ত টাকা ধার দেনা হয়ে দালাল ইমরানের মাধ্যমে এজেন্সি জাবেল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনালকে দিয়েছি। অথচ এ পর্যন্ত একটি টাকা পাঠাতে পারেনি। বৃদ্ধ অসুস্থ্য শ্বশুর-শ্বশুড়ি, তিন সন্তান, দাদি শ্বাশুড়িসহ ৭-৮ জনের সংসার। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি সে ছিলেন। কিভাবে পরিবারটি চলবে কোন কুল কিনারা খুঁজে পাচ্ছিনা। আমার স্বামীকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটাই দাবি, আমার স্বামীকে বাঁচান। তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন কিন্তি নিতে আসা লোকজন আমাদের বাড়িতে আসে, আমি বাড়ি ছেড়ে অন্য বাড়ি পালিয়ে বেড়াই। এখন অনেক সময় কতদিন না খেয়েও দিন পার করছি।

আলী হাসান সোহেলের বৃদ্ধ মা আনজিলা বেগম আহাজারি করে বলেন, “আমি কিচ্ছুই চায়না, শুধু আমার ছেলেকে চাই। সেখানে ওদের ওপর অনেক নির্যাতন করা হচ্ছে। তিনবেলা খাবার দেয়না। আমার সোহেলের তিনটা বাচ্চা এতিম হয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন, আমার ছেলেকে আমার কাছে এনে দিন।”

স্থানীয় কুমড়াকান্দি গ্রামের হামেদ শেখ, কুদ্দুস সরদার, বাবু শেখ, ইমাম আলি সহ কয়েকজন জানান, দালালের খপ্পড়ে পড়ে সোহেলের পরিবার এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন সোহেল। তাদেরকে সুস্থ্য শরীরে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।  

মঙ্গলবার দুপুরে মোবাইলের ভিডিওকলে আলী হাসান সোহেল বলেন, ‘আমাদের রাশিয়ার ৬০ হাজার রুবল (বাংলাদেশি প্রায় ৯০ হাজার টাকা) বেতনে কনস্ট্রাকশন কাজের কথা বলে কোম্পানিতে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রাশিয়া বিমানবন্দরে নামার পরই আমাদের সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। কয়েক দিন প্রশিক্ষণ দিয়ে হাতে অস্ত্র ধরিয়ে তাদের গাড়িতে করে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়া হয়। ইউক্রেনের দখলকৃত চারটি অঞ্চলে আমাদের নামানো হয়। ৩০ জনকে আনা হলেও ১৬ জন এবং ১৪ জনের ২টি দলে ভাগ করে আমাকে ১৬ জনের দলে পাঠায়। রাশিয়ান সেনাসদস্যরা ক্যাম্পে অবস্থান করে আমাদের ভাড়া করা সেনাদের সঙ্গে পাঠানো হতো।’ খাবারের কথা তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, প্রতিদিনি তিন চামিচ খাবার দেয়, সেগুলোর মধ্যে দুধ, সুজি বা তরল সুপের সতো কোন একটি জিনিস, আমরা সেগুলো খেতে পরিনা। 

তিনি আরও বলেন, আমাদের সঙ্গে থাকা ১২ জনের কোনো খোঁজ পাচ্ছি না, সম্ভবত বেঁচে নেই। আমরা চারজনের মধ্যে ১৩ জুন আমিসহ গোপালগঞ্জের পলাশ শেখ আহত হয়ে চিকিৎসাশিবিরে আসি। পরে ১৫ জুন অন্যের কাছ থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে বাড়িতে বিস্তারিত জানাই। তিন দিন আগে ঝিনাইদহের রাজন নামের আরেকজন আহত হয়ে এসেছে। নিরাপদ স্থানে নিয়ে দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করেন আমাদের। বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন, এখান থেকে উদ্ধার করে দেশে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।’ পরিশেষে তিনি বলেন আমাদের এখন যদি দেশে না নেয়া হয় তাহলে সুস্থ হবার পর আবার আমাদের যুদ্ধে পাঠাবে।

এ বিষয়ে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাথী দাস বলেন, বিষয়টি আমি শুনেছি, পরিবারের সাথে আমার কথা হয়েছে।  তাছাড়া বিষয়টি আমি উদ্ধর্তন কতৃপক্ষকে জানিয়েছি। তিনি আরও বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অসহায় পরিবারটির পাশে থেকে সহযোগিতা করা হবে। 

রাজধানী টাইমস

বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬


রাজবাড়ী গোয়ালন্দে দালালের খপ্পরে আলী হাসান সোহেল

প্রকাশের তারিখ : ০১ জুলাই ২০২৬

featured Image

ভালো বেতনে কোম্পানির চাকুরির কথা বলে দালালের খপ্পরে পড়ে পাচার হয়ে রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে মানবতের জীবন যাপন করছেন আলী হাসান সোহেল (৪২) সহ কয়েক যুবক। প্রায় দেড় মাস পর পরিবারের সাথে যোগাযোগ হলে তাঁর কষ্টের কথা জানতে পারেন পরিবার। ড্রোনের আঘাতে আহত হয়ে একটি চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে বাঁচার আকুতি জানিয়েছেন তারা। 

আলী হাসান সোহেল রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার জুড়ান মোল্লার পাড়ার (কুমড়াকান্দি) আঃ হক এর ছেলে। পরিবারের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার বড় আলী হাসানকে দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানিয়েছেন পরিবার। সাথে দালালের উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা। আলী হাসান সোহেল ও সাথে থাকা আরও তিনটি পরিবার গত ১৯ মে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।  

অভিযোগ থেকে জানা যায়, আলী হাসান সোহেল সহ গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার উত্তর পাড়া ঘোসেরচর গ্রামের পলাশ শেখ, দারুলি কুরআন ফকিরবাড়ীর রনি ও বলাকইর এলাকার সৌরভ মোল্লা রাশিয়া যাওয়ার জন্য ঢাকার মালিবাগ এলাকার জাবেল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনার লিমিটেড (আরএল-২৫০৫) এজেন্সির মাধ্যমে গ্রুপের এই ৪ জনের কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা করে ২৮ লাখ টাকা, পাসপোর্টসহ যাবতীয় কাগজপত্র জমা নেয়। পরে মেডিকেলসহ কার্যক্রম সম্পন্ন করে রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে গত ৭ মে বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স নিয়ে রাশিয়া পাঠায়। রাশিয়ার একজন নারী প্রতিনিধি তাদরেকে বিমানবন্দর থেকে রাশিয়া নিয়ে যায়। 


রাশিয়া বিমাবন্দরে পৌঁছানোর পর রিক্রুটিং এজেন্সির পাঠানো ৩০ জনের দলকে হোটেলে রেখে তিনদিন পর সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। চুলকাটা, পোশাক পরিধানসহ সেনাবাহিনীর যাবতীয় কার্যক্রম করে। তাদের চারজনকেও সেনাবাহিনীর বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করে ভারি অস্ত্র (একে-৪৭) হস্তান্তর করেন। কয়েকদিন পর একটু সুযোগ পেয়ে পরিবারের কাছে মুঠোফোনে এসএমএস ও ভয়েসের মাধ্যমে জানায়, তাদের ৩০ জনের প্রত্যেককে রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে ৩০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করে বিক্রি করা হয়েছে। 


গোপালগঞ্জ পলাশ শেখের বাবা জামিল শেখ বলেন, বিষয়টি জানার পর জাবেল-ই-নূর এজেন্সির সাথে যোগাযোগ করে কেন প্রতারণা করা হয়েছে জানতে চাইলে কোন কর্ণপাত করেনি। আমাদের সন্তানদের রাশিয়ান সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণসহ পোশাক পরিহিত ছবি দেখালেও এজেন্সি কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করে এ বিষয়ে যোগাযোগ না করতে ভয়ভীতি দেখায়। এজেন্সির সাথে চুক্তিপত্র অনুযায়ী চারজনের কোম্পানির কাজের কথা বলে নেয়া হয়েছিল, সে কাজ দিতে না পারলে দেশে ফেরত পাঠানোর কথা। তাই আমাদের ২৮ লাখ টাকা, ক্ষতিপূরণসহ স্বশরীরে দেশে ফেরত পাঠাতে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আবেদন জানাচ্ছি। 


আলী হাসান সোহেলের বৃদ্ধ বাবা আঃ হক বলেন, আমার ছেলে এলাকায় অটোরিক্সা চালিয়ে এতবড় সংসার সামলাতো। প্রায় এক বছর আগে ভাতিজা আকাশ জানায়, তাঁদের নিকট আত্মীয় ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর এলাকার ইমরান হোসেন ভালো বেতনে রাশিয়ায় কোম্পানীর চাকুরি দিচ্ছে। ভাতিজার মাধ্যমে ইমরানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে ৮ লাখ টাকায় রাশিয়া পাঠানোর কথা বললেও সাত লাখ টাকায় পাঠাতে রাজি হয়। ৬০ হাজার টাকা দিয়ে চুক্তি করে চার মাসে চার লাখ টাকা পরিশোধ করেন। সর্বশেষ গত ১ মে বাকি তিন লাখ টাকা পরিশোধ করলে ৭ মে তাকে রাশিয়ায় পাঠায়। সমস্ত টাকাই ধারদেনা করে তাদেরকে দেওয়া হয়।  


আঃ হক বলেন, সোহেলের সাথে ভাতিজা আকাশসহ বোয়ালমারীর আরও কয়েকজনের যাওয়ার কথা ছিল। অথচ তারা কেউ না গিয়ে গত ৭ মে ৩০ জনের দলের সঙ্গে আমার ছেলেকে রাশিয়ায় পাঠায়। আমাদের শুধু জানানো হয় কোম্পানির চাকুরীতে যাচ্ছে। দুই বছরের কাজ শেষে আবার দেশে ফিরবে। এমনকি বিমানবন্দের আমাদের যেতে দেওয়া হয়নি। রাশিয়ায় যাওয়ার দেড় মাস পর একদিন ফোন করলে জানতে পারি, তাদেরকে যুদ্ধ করতে রাশিয়া থেকে ইউক্রেন পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে সেখানে একটি অস্থাীয় চিকিৎসা ক্যাম্পে আহত অবস্থায় পড়ে আছে। আমার ছেলেকে ফেরত চাই। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন, আমার সন্তানদের বাঁচান।


আলী হাসান সোহেলের স্ত্রী আকলিমা খাতুন বলেন, “আমার স্বামী রাশিয়া যাবার পর যোগাযোগ করতে পারিনি, খোঁজও নিতে পারিনি। কয়েকদিন পর একদিন ফোন করে জানায়, তাদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে ভাড়া করা সেনাবাহিনীর সাথে পাঠানো হচ্ছে। এরপর আর যোগাযোগ হয়নি। প্রায় দেড় মাস পর হঠাৎ একদিন ফোন করলে দেখি তার চেহারা আর আগের মতো নেই। চুল-দাঁড়ি বড়, হাত ব্যান্ডেজ করা, কানে তুলা পড়া। একটি তাবুর ভিতর থেকে কান্না করছেন আর বাঁচানোর আকুতি জানাচ্ছেন।” 


আকলিমা বলেন, আমরা সমস্ত টাকা ধার দেনা হয়ে দালাল ইমরানের মাধ্যমে এজেন্সি জাবেল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনালকে দিয়েছি। অথচ এ পর্যন্ত একটি টাকা পাঠাতে পারেনি। বৃদ্ধ অসুস্থ্য শ্বশুর-শ্বশুড়ি, তিন সন্তান, দাদি শ্বাশুড়িসহ ৭-৮ জনের সংসার। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি সে ছিলেন। কিভাবে পরিবারটি চলবে কোন কুল কিনারা খুঁজে পাচ্ছিনা। আমার স্বামীকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটাই দাবি, আমার স্বামীকে বাঁচান। তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন কিন্তি নিতে আসা লোকজন আমাদের বাড়িতে আসে, আমি বাড়ি ছেড়ে অন্য বাড়ি পালিয়ে বেড়াই। এখন অনেক সময় কতদিন না খেয়েও দিন পার করছি।


আলী হাসান সোহেলের বৃদ্ধ মা আনজিলা বেগম আহাজারি করে বলেন, “আমি কিচ্ছুই চায়না, শুধু আমার ছেলেকে চাই। সেখানে ওদের ওপর অনেক নির্যাতন করা হচ্ছে। তিনবেলা খাবার দেয়না। আমার সোহেলের তিনটা বাচ্চা এতিম হয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন, আমার ছেলেকে আমার কাছে এনে দিন।”


স্থানীয় কুমড়াকান্দি গ্রামের হামেদ শেখ, কুদ্দুস সরদার, বাবু শেখ, ইমাম আলি সহ কয়েকজন জানান, দালালের খপ্পড়ে পড়ে সোহেলের পরিবার এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন সোহেল। তাদেরকে সুস্থ্য শরীরে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।  


মঙ্গলবার দুপুরে মোবাইলের ভিডিওকলে আলী হাসান সোহেল বলেন, ‘আমাদের রাশিয়ার ৬০ হাজার রুবল (বাংলাদেশি প্রায় ৯০ হাজার টাকা) বেতনে কনস্ট্রাকশন কাজের কথা বলে কোম্পানিতে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রাশিয়া বিমানবন্দরে নামার পরই আমাদের সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। কয়েক দিন প্রশিক্ষণ দিয়ে হাতে অস্ত্র ধরিয়ে তাদের গাড়িতে করে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়া হয়। ইউক্রেনের দখলকৃত চারটি অঞ্চলে আমাদের নামানো হয়। ৩০ জনকে আনা হলেও ১৬ জন এবং ১৪ জনের ২টি দলে ভাগ করে আমাকে ১৬ জনের দলে পাঠায়। রাশিয়ান সেনাসদস্যরা ক্যাম্পে অবস্থান করে আমাদের ভাড়া করা সেনাদের সঙ্গে পাঠানো হতো।’ খাবারের কথা তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, প্রতিদিনি তিন চামিচ খাবার দেয়, সেগুলোর মধ্যে দুধ, সুজি বা তরল সুপের সতো কোন একটি জিনিস, আমরা সেগুলো খেতে পরিনা। 


তিনি আরও বলেন, আমাদের সঙ্গে থাকা ১২ জনের কোনো খোঁজ পাচ্ছি না, সম্ভবত বেঁচে নেই। আমরা চারজনের মধ্যে ১৩ জুন আমিসহ গোপালগঞ্জের পলাশ শেখ আহত হয়ে চিকিৎসাশিবিরে আসি। পরে ১৫ জুন অন্যের কাছ থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে বাড়িতে বিস্তারিত জানাই। তিন দিন আগে ঝিনাইদহের রাজন নামের আরেকজন আহত হয়ে এসেছে। নিরাপদ স্থানে নিয়ে দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করেন আমাদের। বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন, এখান থেকে উদ্ধার করে দেশে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।’ পরিশেষে তিনি বলেন আমাদের এখন যদি দেশে না নেয়া হয় তাহলে সুস্থ হবার পর আবার আমাদের যুদ্ধে পাঠাবে।


এ বিষয়ে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাথী দাস বলেন, বিষয়টি আমি শুনেছি, পরিবারের সাথে আমার কথা হয়েছে।  তাছাড়া বিষয়টি আমি উদ্ধর্তন কতৃপক্ষকে জানিয়েছি। তিনি আরও বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অসহায় পরিবারটির পাশে থেকে সহযোগিতা করা হবে। 


রাজধানী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. শাহিদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত রাজধানী টাইমস ২৪