রাজধানীর সরকারি সাত কলেজের জন্য নতুনভাবে গঠিত ‘ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়’ (DCU) নাম নিয়ে আপত্তি তুলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (DU) শিক্ষার্থীদের একাংশ। তারা দাবি করছেন, নামটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় ভবিষ্যতে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে, যা চাকরি, টিউশন ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে সমস্যা সৃষ্টি করবে। এছাড়া এমন নাম সাংঘর্ষিক বলে নানান যুক্তি সামনে এনেছেন তারা।
গত ১৬ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (UGC) এক সভায় শিক্ষার্থীদের ৩২ সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে ‘ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম চূড়ান্ত হয়েছে। যা ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ নামে রাজধানীর সরকারি সাতটি কলেজগুলোর কার্যক্রম পরিচালিত হবে। তবে এর বিরোধিতা করে ২০ মার্চ ঢাবির একাংশ শিক্ষার্থী উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান বরাবর স্মারকলিপি জমা দেয়। তারা দাবি জানিয়েছে, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম থেকে ‘ঢাকা’ শব্দটি বাদ দিতে হবে এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন, স্বতন্ত্র একটি নাম নির্ধারণ করতে হবে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে নামের পক্ষে বিপক্ষে নানা ধরনের যুক্তি আসছে। দুই নাম কাছাকাছি হওয়ায় এর বিরোধীতা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একাংশ। শিক্ষার্থীরা বলছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সর্বপ্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এটির সংক্ষিপ্ত রূপ ‘DU’ যা দেশ-বিদেশে সুপরিচিত। নতুন প্রতিষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সঙ্গে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সাদৃশ রয়েছে। ‘ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়’ নামের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে মাত্র একটি শব্দের পার্থক্য এবং উচ্চারণে ও সংক্ষিপ্ত রূপে (DU ও DCU) প্রায় একই রকম শোনায়। এটি শিক্ষার্থীদের পরিচয়, টিউশন, চাকরির ক্ষেত্র এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে সমস্যা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় নামে আপত্তি জানিয়ে শিক্ষার্থীরা স্মারকলিপিতে ৫টি যুক্তি সামনে এনেছেন। প্রথমত নাম জনিত বিভ্রান্তি: ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ ও ‘ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়’— দুটি নামের মধ্যে মাত্র একটি শব্দের পার্থক্য রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবে।
দ্বিতীয়ত স্থানীয় পর্যায়ে জটিলতা: বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের পক্ষে পার্থক্য করা কঠিন হবে, যা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করতে পারে।
তৃতীয়ত প্রতারণার ঝুঁকি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সঙ্গে মিল থাকায় টিউশন জালিয়াতি বা প্রতারণার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
চতুর্থত চাকরির বাজারে প্রতিকূলতা: চাকরির আবেদন প্রক্রিয়ায় দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দিতে পারে, যা তাদের ক্যারিয়ারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পঞ্চমত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমস্যা: বিদেশি শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দিতে পারে, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সুনাম ক্ষুণ্ন করতে পারে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীদের তিন দাবি হলো, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম থেকে ‘ঢাকা’ শব্দটি বাদ দিতে হবে; বিভ্রান্তি এড়াতে সম্পূর্ণ ভিন্ন, স্বতন্ত্র মৌলিক একটি নাম নির্ধারণ করতে হবে, যেমন ‘বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়’ (Central University of Bangladesh) বা ‘মহানগর বিশ্ববিদ্যালয়’ (Metropoliton University এবং ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিকট আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়ে নাম পরিবর্তনের জন্য সুপারিশ করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের আরও যুক্তি, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ ও ‘ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়’—এই দুটি নামের মধ্যে মাত্র একটি শব্দের পার্থক্য থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হবে। চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি আসলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। বিশ্বের বহু দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম মিল থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা কোনো সমস্যা ছাড়াই নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে পারে। ঢাবির একাংশ শিক্ষার্থীর এই বিরোধিতা মূলত তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখার একটি কৌশল মাত্র। তারা চায় না, নতুন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শক্ত অবস্থান তৈরি করুক বা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করুক।
এ নিয়ে ঢাবির প্রশাসন জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের দাবি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির কাছে তুলে ধরা হবে। তবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করা হবে কি না, সেটি নির্ভর করবে সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর।