দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন ও আমাদের প্রত্যাশা

নির্বাচন এবং সরকার উভয়েই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্র গঠনের জন্য যে চারটি উপাদান প্রয়োজন সরকার তার মধ্যে একটি। সরকার গঠনের সার্বজনিক প্রক্রিয়া হচ্ছে নির্বাচন কিন্তু সেই নির্বাচন হওয়া চাই সংঘাতমুক্ত। নির্বাচন আসলেই আমাদেরকে ভয়ে ভয়ে থাকতে হয় এই স্বাধীন দেশে। যা গণতান্ত্রিক পরিবেশকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। হানাহানি, মারামারি, কাটাকাটি, ভংচুর ও জোর দখল। যার শেষ পরিণতি রক্ত এবং চোখের জলে। আমরা সাধারণ নাগরিক হিসেবে তা কোন ভাবেই প্রত্যাশা করি না।

একটি দেশের চলমান উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষার জন্য একটি সংঘাতমুক্ত নির্বাচন প্রয়োজন। তবে সেখানে রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা থাকতে হবে। সংঘাতের মাধ্যমে দেশ ও জনগণের সেবা ও উন্নয়ন কোনটাই সম্ভব নয়। আমরা নির্বাচনী উৎসবের পরিবেশ চাই। উৎকন্ঠার নির্বাচনী পরিবেশ চাই না। নির্বাচন যেন ভোট দখল ও ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার না হয়। নির্বাচন হতে হবে দেশ ও জনগণের সেবা এবং উন্নয়ন, সমৃদ্ধি, শান্তি এবং নিরাপত্তার আদর্শ। নির্বাচন চলাকালীন সময়ে এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সংঘাতের ফলে দেশের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় হাজার কোটি টাকার ওপরে। যারা সংঘাত-সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে তারা প্রায় সকলেই সকলের আত্মীয়, পরিচিত জন। তবে এ সংঘাত শুধুমাত্র ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং ক্ষমতা দখলের জন্য। সংঘাত বন্ধ করতে পারলে গণতন্ত্রের বিজয় হবে, গণতন্ত্র মুক্ত হবে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনায় ধর্মনিরপেক্ষ, শোষণমুক্ত সমাজ, রাষ্ট্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই নির্বাচন চলাকালীন সময়ে এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সংঘাত রোধ করা সম্ভব। বাণিজ্যের রাজনীতির পরিবর্তে সেবার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নির্বাচনে সংঘাতের আরো একটি বড় মৌসুমী সুবিধাভোগীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ। নির্বাচনী কর্মী এবং ভোটাররা যদি এই মৌসুমী সুবিধাভোগীদের পরিহার বা বজর্ন করতে পারেন তবে সংঘাতের একটা অংশ বন্ধ হবে। আমরা সংঘাত চাই না। আমরা সম্প্রীতি ও সহঅবস্থান নিশ্চিত দেখতে চাই, যে কোন মূল্যে। নির্বাচন চলাকালীন সময়ে এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সংঘাতমুক্ত বাংলাদেশ দেখতে চাই। এর জন্য রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রয়োজন সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা, উদার মনোভাব। যেখানে সরকারকেই মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হয়। সকল দলের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমেই নির্বাচনী সংঘাত পরিহার করা সম্ভব হবে। নির্বচনে কালো টাকার ব্যবহার বন্ধে আরো কঠোর হতে হবে। আইন এবং প্রশাসনের সাংবিধানিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সংঘাত বন্ধ করতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন জনগণের সচেতনতা ,বিবেকের জাগরণ ও দেশপ্রেম। যদি আমরা সংঘাত বন্ধ করতে পারি তবেই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠন করা সম্ভব হবে। ত্রিশলক্ষ শহীদের রক্ত ও দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের ঋণ কিছুটা হলেও পরিশোধ হবে। আমরা ঋণ পরিশোধ করতে চাই,আমরা সংঘাতমুক্ত নির্বাচন চাই এবং আমরা সংঘাতমুক্ত চাই।

বিজ্ঞাপন

নির্বাচনে নির্বাচিত প্রার্থীরা দেশের শাসনভার গ্রহণ করে দেশ পরিচালনায় অংশ নিবেন। দেশের জনগণের এবং দেশের উন্নয়নের চিন্তা মাথায় রেখে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করবেন এবং বাস্তবায়ন করবেন। দেশের ৯২ভাগ মেহনতি মানুষের মানুষের জন্য শ্রমনীতি,স্বাস্থ্যনীতি, শিক্ষানীতি,শিল্পনীতি প্রণয়ন করবেন এবং তার বাস্তবায়ন করবেন। নাকি জাতীয় সংসদকে কোটিপতিদের ক্লাবে পরিণত করবেন? যদি দেশের অধিকাংশ মানুষের কথা ভাবেন তবে নির্বাচন হতে হবে কালো টাকা মুক্ত, পেশী শক্তি মুক্ত এবং প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত। পৃথীবির অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যতিক্রম। এখানে বড় বড় রাজনৈতিক দলের নেতারা প্রার্থীরা কোটি কোটি টাকা নির্বাচনে ব্যয় করে নির্বাচনীত হয়ে জনগণের সেবা করতে। আর এইভাবে জনগণের সেবা যাই হোক নিজের সেবার ষোল আনাই পূর্ণ হয়। নির্বাচনকে তারা বিনিয়োগের কেন্দ্রে পরিণত করে রেখেছেন। এর বিপরীত কিছু চিত্রও দেখা যায় আমাদের জাতীয় ও অন্যান্য নির্বাচন গুলোতেও। জাতীয় চেতনায় এবং দেশপ্রেমে সমৃদ্ধ কিছু রাজনৈতিক দল জনগণের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আর্থিক সহায়তায় তাদের নির্বাচনী ব্যয় পরিচালনা করে দেশ ও জনগণের সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য এবং দেশের কাঙ্খিত উন্নয়ন লক্ষ্যকে অর্জন করার জন্য। অন্যদিকে নির্বাচনকে যদি ৯২ ভাগ মানুষের করতে হয় তবে তার দায়িত্ব ৯২ ভাগ মানুষকেই নিতে হবে। জনগণকে যেমন তাদের পরিক্ষীত প্রার্থীদেরকে ভোট দিতে হবে তেমনি তাদেন নির্বাচনী বা ভোটের ব্যয়ভারের দায়িত্বও বহন করতে হবে। তবেই একটি নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরেপেক্ষ হওয়ার একটি দাবী রাখে এবং সত্যিকার অর্থেই তখনই নির্বাচন হবে জনগণের অন্যথায় নির্বাচন হবে কোটিপতিদের ক্লাবের সদস্য হওয়ার প্রতিযোগিতা মাত্র।

আমাদের দেশের নির্বাচনগুলো মূলত দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভোট নিয়ে স্বার্থ রক্ষা করছে শোষক শ্রেণির,মালিক শ্রেণির,ক্ষমতাসীন মহলের এবং নির্বাচনে কালো টাকা ব্যয়কারীদের ভাগ্য পরিবর্তনে। প্রার্থীরা নির্বাচিত হন জনগণকে উন্নয়নের প্রতিশ্রæতি দিয়ে আর নির্বাচিত হয়ে নিজের উন্নয়নে ব্যস্ত হয়ে পড়েন ।

ইদানিংকাল প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়ে আরো বেশি ব্যস্ত থাকছেন স্ত্রীর উন্নয়ন ও উন্নতির জন্য। যার প্রমাণ আমরা পাই নির্বাচনী হলফ নামার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়া এবং ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার মাধ্যমে। আমরা দেখি প্রত্যেক প্রার্থীর সম্পদের পরিমাণ তার স্ত্রীর সম্পদের চেয়ে কম। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বরাবরই থেকেছে বঞ্চিত , অবহেলিত এবং নিপীড়িত। নির্বাচনে ব্যবসায়ীদের সংখ্যা হো হো করে বাড়ছে অন্যদিকে শিক্ষক, এ্যাডভোকেট, প্রকৌশলী, কৃষকদের সংখ্যা ঠিক তেমনি জ্যামিতিক হারে কমছে। জাতীয় নির্বাচন এবং দেশের জন্য শুভকর নয়। স্বাধীনতার ৫২বছরে দেশে এগারোটি নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু কোন নির্বাচনই গণমানুষের চলমান সংকট মোকাবেলায় এবং মোচনে তেমন কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি।

বিজ্ঞাপন

এগারোটি নির্বাচনই সমাজে ছোট-বড় অনেক অসঙ্গতি সৃষ্টি করেছে এবং প্রতিদিনই আমরা তার খেসারত দিচ্ছি ও ফল ভোগ করছি। প্রতিদিন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মানুষের ব্যয়ভার কিন্তু সেই হারে মানুষের আয় বাড়ছে না। গুটিকতক মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হলেও বেশিরভাগর মানুষই থেকে যাচ্ছে দারিদ্র সীমার নিচে । একদিকে বাড়ছে কিছু কোটিপতিদের সংখ্যা অন্যদিকে বেশিরভাগ মানুষ ভূমিহীন হচ্ছে, আশ্রয়হীন হচ্ছে এবং বেঁচে থাকার নূন্যতম চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে,তরুণ সমাজ, যুব সমাজ হতাশাগ্রস্থ হয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে, তারা বিপথগামী হচ্ছে। গত এগারোটি নির্বাচন তাদের সামনে কোন নবদিগন্তের উন্মোচন করতে পারেনি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তরুণ সমাজকে, যুব সমাজকে সেই হতাশা থেকে মুক্তি দিবে, গনমানুষের মৌলিক অধিকার পূরণের শিশ্চয়তা দিবে, চিন্তা ও সৃজনশীল মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিবে। নির্বাচন হবে অধিকার আদায়ের প্লাটফরম। নির্বাচন তুমি কী ৯২ভাগ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে, জাতীয় মুক্তির জন্যে ? নাকি ৮ভাগ মানুষের আরো সম্পদ বৃদ্ধির জন্য,বিদেশে সেকেন্ড হোম মালিকদের রক্ষা করার জন্য, দুর্নীতিবাজ ও লুটেরাদের রক্ষা করার জন্যে ? অশ্লীলতা ও অপসংস্কৃতি পোষণকারী ও লালনকারীদের পক্ষে নাকি এদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠাদের পক্ষে ?

৯২ভাগ মেহনতি মানুষের একজন হিসেবে আমার চাওয়া নির্বাচন যেন হয় আমাদের মুক্তির হাতিয়ার, জাতীয় সমৃদ্ধিও হাতিয়ার, শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের হাতিয়ার, সুশাসন প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার, মাদকমুক্ত সমাজ এবং রাষ্ট্র গঠনের হাতিয়ার। দেশের মালিক জনগণ এবং ভোটের মালিকও জনগণ। তাই নির্বাচন যদি জনগণের জন্য হয় এবং জনগণের হয় তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনই হবে আগামীর বাংলাদেশ , যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ শোষণমুক্ত সোনর বাংলাদেশ। যেই বাংলাদেশের জন্য ৭১‘এ ত্রিশ লক্ষ মানুষ শহিদ হয়েছেন, দুই লক্ষ মা-বোন তার ইজ্জত দিয়েছেন। বিজয়ের সাথে আমাদের নির্বাচনের একটি গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। নির্বাচনের মাধ্যমেই আমাদের মুক্তি ও বিজয়ের পদচিহ্ন অঙ্কিত হয়েছিল। সেই দিনের সেই নির্বাচনী ইশতেহার সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল, জাগিয়ে তুলেছিল। সেই দিনের সেই নির্বাচন আমাদেরকে একটি স্বাধীন মানচিত্র এবং একটি স্বাধীন পতাকা দিয়েছিল।

আজকের নির্বাচনও তেমনি আমাদের স্বাধীনতাকে রক্ষা করার জন্যে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বাস্তবায়ন করার জন্যে এবং অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সেই দিনের নির্বাচন আমাদেরকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শাসন, শোষণ, নিপীড়ন, নির্যাতন, লুটপাট, অত্যাচার আর পাকিস্তানি ২২ পরিবারের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছিল। আজকের নির্বাচন দেশীয় শোষক, দুর্নীতিবাজ, লুটপাটকারী, ঋণখেলাপী এবং পাকিস্তানিদের দোসর, সাফাইকারী, সেই দিনের পরাজিত শক্তির বিরুদ্ধে আরেকবার বীর বাঙালি গর্জে উঠবে। নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের জাতীয় মুক্তি মিলবে, মিলবে অর্থনৈতিক মুক্তি, দূর হবে বেকার সমস্যা, সকলের সমাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে, মুক্ত চেতনার বিকাশ ঘটবে, মানুষে-মানুষে সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাবে এই প্রত্যাশা আমাদের সকলের।

 

সুধীর বরণ মাঝি, শিক্ষক, হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর।

শীর্ষ সংবাদ:
মাদারীপুরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত ৫ বোনকে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছে ফেরার পথে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ভাই নিহত শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন পাইকগাছায় সরকারি জমিতে গড়ে ওঠেছে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা, হারাচ্ছে কোটি টাকার রাজস্ব শরণখোলায় একুশের বই মেলায় রক্তদান কর্মসূচির উদ্বোধন দুই যুগের যাত্রী হয়রানির অবসান করলেন দুই সংসদ সদস্য শিক্ষক হেনস্থার: পবিপ্রবিতে ত্রি-মুখী আন্দোলনে উত্তাল ক্যাম্পাস মায়ের জানাজায় অংশ নিতে দেশে ফিরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল ২ জনের স্ত্রীর সঙ্গে অভিমান করে স্বামীর আত্মহত্যা রোজার আগে সরকারিভাবেই চিনির দাম বাড়ল কেজিতে ২০ টাকা চেম্বার ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অ্যানেসথেসিয়া প্রদান করা যাবে না: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ঝিনাইদহে রাতে- দিনে অবৈধভাবে মাটি বিক্রির রমরমা ব্যবসা, নিরব ভুমিকায় প্রশাসন হুমকির মুখে বাংলা ভাষা প্রধানমন্ত্রীকে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্টের অভিনন্দন খতনা করাতে গিয়ে শিশুর মৃত্যু: দুই চিকিৎসককে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলনের পথ দিয়েই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি: প্রধানমন্ত্রী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়: বাংলা ও নিজস্ব বর্ণমালা নিয়ে ভাষা শহিদদের স্মরণে আদিবাসী শিক্ষার্থীরা বকশীগঞ্জে দুই মোটর সাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ১ বাকৃবিতে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত বাস-ট্রলিতে সংঘর্ষে বাড়িতে ঢুকল বাস, নিহত ২, আহত ১০